পাশের ওই রুম থেকে ক্যামন যেন একটা শব্দ আসছে ( বাংলা গল্প- ২)

                                                            



পাশের ওই রুম থেকে ক্যামন যেন একটা শব্দ আসছে। কান্নার শব্দের মতো মনে হলেও আসলে তা কান্নার শব্দ নয়। ওই একা একটা রুমে আমাদের ম্যাচের বাবুর্চি শহীদুল চাচা ছাড়া আর কেউ ঘুমায় না। ওনি আমাদের বাবার বয়সী। আর তাই আমরা সবাই ওনাকে চাচা বলে ডাকি। মুরব্বি বলে ওনাকে আলাদা একটা রুম দেয়া হয়েছে। ওনি রুমমেট হলে অনেকে ইজি ফিল করে না। খোলামেলা কথা বলতে গিয়ে অনেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।

রাত বাজে ৩টা। একমাত্র আমি ছাড়া বাসায় এখন আর কেউ সজাগ নেই। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সামনে বইমেলা। তাই নিরলসভাবে গল্পগুলোকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। নইলে আমিও ঘুমিয়ে পড়তাম। আজ আবার শুক্রবার। বেশিক্ষণ সজাগ থাকতে চাইলেও থাকা যাবে না। সকালবেলা গোসল কার্য সেরে ৮টার দিকে কাজে যেতে হবে। লাঞ্চ টাইম হলে পরে লাঞ্চ না করে জুম'আ'র নামাজে অংশ নিতে হবে।
এখন পাশের রুম থেকে খুব অস্বাভাবিক শব্দ আসছে। এডিটিংয়ে আর মন বসছে না। ল্যাপটপ অফ করে চুপিচুপি চাচার রুমে ঢুকলাম। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলাম। চাচার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম, গায়ে অনেক জ্বর। তিনি আসলে কাঁদছেন নাকি কষ্টে গোংগাচ্ছেন কিছুই বুঝতে পারছি না। বিষয়টা বোঝার জন্য লাইটটা জ্বালিয়ে নিলাম। চাচাকে বিছানায় বসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'চাচা, গায়ে তো অনেক জ্বর। ঔষধ খেয়েছেন?' তিনি হাতের ইশারায় 'না' বললেন। কিছু খাবেন কি না জিজ্ঞেস করলাম। তা-ও না করলেন। বললেন, 'ভাল্লাগছে না।' তিনি তাঁর মোবাইলটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'বাবা রুবজ, দেখো তো ম্যাসেজটা কে দিলো?'
শহীদুল চাচা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ। ওনার দুইটা মেয়ে আছে। বড় মেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্রী। আর ছোট মেয়ে ইন্টারে পড়ছে। যতদূর জানি, দুই মেয়েই দারুণ মেধাবী। চাচা দশ বছর আগে ইতালিতে এসেছেন। এখনো দেশে যাননি। যাবেনই বা ক্যামনে? চাচা এখনো যে বৈধতা পাননি। ভিটেমাটি, জায়গা-জমিন হালের বলদ সবকিছু বিক্রি করে দালালের মারফতে ইতালি এসে পৌঁছেছিলেন। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সিরিয়া পর্যন্ত ডাংকি মেরে এসেছেন। ডাংকি মারা মানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে, দৌড়ে, সাঁতার কেটে, পরিবহনে, বিভিন্ন পণ্যবাহী লরীর ভেতরে লুকিয়ে অবৈধভাবে নানা দেশের বর্ডার অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোকে বোঝায়। যারা এ পথে মরণের ঝুঁকি নিয়ে এসেছেন, তারা আমার চেয়ে ভালোই বলতে পারবেন এর বাস্তবিক সংজ্ঞা। সিরিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর সেই দুর্বিষহ ভয়ংকর লঞ্চ জার্নির বর্ণনা দিতে গিয়ে একবার শহীদুল চাচা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'বাবা রুবজ, দশ বছর আগেই আমি মইরা গেছি। এখনতো আমার দুই মেয়ের কিসমতে বাঁইচা আছি। ওদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি না দেয়া পর্যন্ত আল্লাহ্‌ যেন আমার মরণ না দেন, হেই দোয়াটা করিও।'
আমি আবেগপ্রবণ মানুষ না। তবুও চাচার দায়িত্ববোধ আর মেয়েদের প্রতি ভালোবাসা দেখে চোখের কোণে জল চলে এলো। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, বাবারা বুঝি এমনই হয়। নিজের জীবন, সুখ, সাধ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে তারা বদ্ধপরিকর।
শহীদুল চাচার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে ম্যাসেজটা পড়লাম। তিনি আমার পিঠে হাত রেখে বললেন,
- বাবা, কে দিছে ম্যাসেজ?
- আপনার ছোট মেয়ে।
- কী লিখছে?
- আগামীকাল রেজিস্ট্রেশনের শেষ তারিখ। ইমার্জেন্সী গোটা পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে বলছে। আপনাকে নাকি পনেরো-ষোলো দিন আগে বলেছিল। কিন্তু আপনি টাকা পাঠান নি। আগামীকাল যদি রেজিস্ট্রেশন না করতে পারে, তাহলে সে এইচ.এস.সি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
শহীদুল চাচা ছোট মেয়ের ম্যাসেজটা শুনে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন। ওনাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে না কিছুক্ষণ আগে ওনার শরীরের ওপর দিয়ে কী পরিমাণ ঝড় বয়ে গিয়েছিল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন,
- বাবা রুবজ, নেটটা একটু দেখবা বৃষ্টি আছে কী না?
আমি নেটে ন্যাপলির আবহাওয়া সার্চ দিয়ে বললাম, 'হ্যাঁ চাচা, ভোর চারটা থেকে কোপা বৃষ্টি। সারাদিন বৃষ্টি দেখাচ্ছে।'
তিনি হাতে করে বিশ পঁচিশটা ছাতা নিয়ে বেরোতে লাগলেন। আমি বাঁধা দিলাম। কইলাম, 'দুই টাকার ছাতার জন্য অমূল্য জীবনটা হারাবেন। তারচেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েন। টাকা না থাকলে আমার কাছে থেকে ধার নেন। তবুও ছাতা বিক্রি করতে যাইয়েন না।'
কে শুনে কার কথা। তিনি আমার কথার কোনো তোয়াক্কা না করে বললেন, 'বাবা, দুই ঘণ্টা ছাতা নিয়া ঘুরবো। দেখি ন্যাপলি ট্রেন স্টেশনের দিকে গিয়া গোটা পঞ্চাশ ইউরো বিক্রি করা যায় কী না। সবসময় তো আর বৃষ্টি আসে না। বিদেশ আসছি দুই পয়সা রোজগার করতে, শুয়ে বসে থাকলে কি আর সংসার চলবে?'
মানুষটা এই জ্বর নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বাহিরে শুধু বৃষ্টি না, সঙ্গে দমকা বাতাসও বইছে। আমার ঘুম আসছে না শহীদুল চাচার কথা ভেবে। কীভাবে এই বৃষ্টির মধ্যে মানুষটা টিকে আছে আল্লাহ্‌ মালুম, যেখানে ঠাণ্ডায় ঘরের ভেতরে টিকে থাকা দায়।
তখন ভোর ৭টা বাজে। শহীদুল চাচা আমার গায়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে ডাকছেন, 'বাবা রুবজ, সজাগ আছো? একটু উঠবা?'
আমি ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলাম, শহীদুল চাচা আমার শিথানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। এক্কেরে কাকভেজা অবস্থা। ঠাণ্ডায় হু হু করে কাঁপছেন। ঘুমঘুম চোখে বললাম, 'কী চাচা, এখনো ঘুমাননি?'
তিনি বৃষ্টিতে ভেজা দুটো দশ ইউরোর নোট একটা বিশ ইউরোর নোট আর এক ইউরোর বিশটা কয়েন আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'বাবাজি, আজই আমার ছোট মেয়ের নাম্বারে এই টাকা গুলা বিকাশ করে দেবে। মানি ট্রান্সফারের অফিসে যাওয়ার মতো অবস্থা আজ আমার নেই।'
আমি টাকা গুলো বালিশের নীচে রাখতে না রাখতে শহীদুল চাচা মাথা ঘুরে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওনাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। নিজের হাতে ভেজা কাপড় বদলিয়ে তাঁর বিছানায় তাঁকে শোয়ালাম। কিছুক্ষণ পরপর ওনি কেঁপে কেঁপে ওঠছেন। ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছেন। ভালোভাবে খেয়াল করে তাকালে দেখা যায়, ওনি যখন কাঁপছেন, সঙ্গে সঙ্গে ওনার পুরো বিছানাও কেঁপে ওঠছে। কিছু খাবেন না আগেই বলে দিয়েছেন। তবুও জোর করে দুই পিছ বিস্কিট খাওয়ালাম। পরে একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে তাঁকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলাম। আমি জানি, তিনি ঘুমাতে পারবেন না। কারণ, জ্বরের অবস্থা খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। কাজে যাবার আগে আমাদের ম্যাচের ম্যানেজারকে বলে গেলাম, 'চাচার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না। তাড়াতাড়ি ডাক্তার অথবা ঔষধের ব্যবস্থা করেন।'
এখন দুপুর ১টা বেজে ৪৫ মিনিট। জুমা'আ'র নামাজ শেষে মোনাজাতের জন্য বসে আছি। মোনাজাতের আগে ইমাম সাহেব মাইকে এলাউন্স করলেন,'মৃত্যুসংবাদ! ন্যাপলি, গারিবালদি নিবাসী জনাব শহীদুল ইসলাম ভাই কিছুক্ষণ আগে ন্যাপলি হাসপাতালে ইন্তিকাল করিয়াছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন। মরহুমের দেশের বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। আল্লাহ্‌ যেন মরহুমকে জান্নাতের মেহমান হিশেবে কবুল করে নেন, আমিন। আর মোনাজাত শেষে আপনারা সাধ্যমতো যে যত পারেন, দান করে যাবেন। যাতে লাশটা দুই সপ্তাহের ভেতরে মরহুমের পরিবারের কাছে আমরা হস্তান্তর করতে পারি।'
আমি এই এলাউন্স শোনার জন্য স্বপ্নেও প্রস্তুত ছিলাম না, আর বাস্তবে তো প্রশ্নই আসে না। নামাজ, মোনাজাত সবি রেখে পাগলের মতো ছুটছি বাসার দিকে। রাস্তা যেন ফুরাচ্ছে না। কিছুক্ষণের জন্য আমি বেমালুম ভুলে গেছি আমার যে দুপুর ২টার ভেতরে আবার কাজে জয়েন করতে হবে। বাসায় ফিরে তড়িঘড়ি করে শহীদুল চাচার রুমে ঢুকলাম। শহীদুল চাচা বিছানায় নেই ভাবা যতটা সহজ, তারচেয়ে কয়েক হাজার গুণ কঠিন মনে হচ্ছে যখন ভাবছি, শহীদুল চাচা এই দুনিয়াতে আর নেই। ওনার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বিছানায় পড়ে আছে। কী মনে করে মোবাইলটা হাতে নিলাম ঠিক জানি না। হাতে নিয়ে দেখি স্কিনে একটা ম্যাসেজ শো করছে। ওপেন করে দেখি ওনার ছোট মেয়ের ম্যাসেজ।
'একটু আগে বিকাশে ৫ হাজার ১৮৫ টাকা পেয়েছি বাবা। কালকেই রেজিস্ট্রেশন করে ফেলবো। আর আমার জন্য দোয়া করবে, যাতে এইচ.এস.সি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করি। তুমি বলছিলে, এস.এস.সি'তে ভালো রেজাল্ট করলে দেশে আসবে। কিন্তু এলে না। এবার সত্যি সত্যি আসবে তো?'
শহীদুল চাচা || রুবজ এ রহমান

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post